Main Menu

গরু নিয়ে গুরুতর চিন্তা

গরু। শুধু গ্রামেই নয়, শহর-নগরেও গরু যে কত গুরুত্বপূর্ণ, কত গরীয়ান, কত গর্বের একটি প্রাণী তা বোঝা যায় এলে কোরবানি। ‘গরু খোঁজা’র কথাটা গ্রামে প্রচলিত হলেও কোরবানির ঈদের সময় শহরেও চলে গরু খোঁজাখুঁজি, মূল্য বোঝাবুঝি এবং সোজাসুজি  না হলেও দরকষাকষি, টাকা খসাখসি নিয়ে রেষারেষি, কে খরচ করবে কম, কে বেশি— এসব শেষে বিজয়ীর বেশে সবাই গরু কিনে বাড়ি ফিরতে চান। এখন রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার পাশাপাশি হাঁটছে গরু। বসছে হাট, ভরছে মাঠ। দড়ি-ছড়ি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন অনেকেই।

যাই হোক, সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় ঈদে গরু একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এই সময় সারা দেশে অফিস-আদালত, বাড়িঘর, দোকানপাট, বাজারহাট সব জায়গাতেই আওয়াজ একটাই— গরু আর ছাগল। এখন মিডিয়ায়ও গরু-ছাগলের স্থান শীর্ষে। গরু গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। টিভি খুললেই এখন অনেক গরু দেখা যায়। নানান আকৃতির, নানান প্রকৃতির, নানান রঙের, নানান ঢঙের। পত্রিকার পাতায়ও গরুর রঙিন ছবি। হাটে দেখা যায় গরুর শিংয়ে রং, কপালে লাল কাপড়ের টিকলি, তেল চকচকে চামড়া, গলায় জরির মালা। দুটি বিশেষ সময়ে আমাদের দেশে এই মালার কদর বেড়ে যায়— নির্বাচন এবং কোরবানি। নির্বাচনের সময় মানুষের গলায় আর কোরবানির সময় গরুর গলায়। গরু অবোধ প্রাণী— কে কখন, কেন মালা দিল তা বুঝতে পারে না। তবে মানুষ বুঝতে পারে। বিশেষ পুরস্কার বা সম্মান জানানোর জন্য মানুষকে এই মালা দেওয়া হয়। যদিও কিছু কিছু ‘মাল্য’ ও পুরস্কারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তদবির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তদবিরের মাধ্যমে পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য কেউ কেউ ‘বীর-এ-তদবির’ খেতাবও পেয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তির পর এরা জমকালো অনুষ্ঠান করেন। সেখানে সুলভে প্রাপ্য কিছু বুদ্ধিজীবী এসে ভাষণও দেন। বিষয়— গুণকীর্তন। তবে সব পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুষ্ঠান হয় না। কারণ লোক ডেকে আপ্যায়ন করে সামনে বসে নিজের প্রশংসা শুনতে সবাই ভালোবাসেন না বরং লজ্জা পান। অবশ্য এ ক্ষেত্রে গরু ব্যতিক্রম। গরুর গলায় মাল্যদানের জন্য গরুরা কোনো তদবির বা তোষামোদ করে না। অবোধ প্রাণী মালার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

কোরবানির সময় একশ্রেণির মানুষ গো-রাজনীতি শুরু করেন। অনেক নেতা আছেন যারা সারা বছর গ্রামে না গেলেও কোরবানির সময় দু-তিন দিনের জন্য হলেও গ্রামে যান। গরু নিয়ে শোডাউন করেন। শোডাউন শব্দটি জনসভায় অধিক জনসমাগমের ওপর নির্ভর করলেও গরু শোডাউন একটু ভিন্ন প্রকৃতির। নেতার চামচারা মিছিল করে গলায় মালা এবং কপালে টিকলি পরিয়ে হাট থেকে গরু নিয়ে আসে। তারপর বাড়ির সামনে শামিয়ানা টাঙিয়ে গরু প্রদর্শন করে। যিনি বা যারা দেখতে আসে তাদের বলা হয়, এগুলো নেতার গরু। আপনাদের জন্য কিনেছেন। ঈদে আসবেন। অনেকে গরুর আকৃতি দেখে বলেন, বাঃ দারুণ গরু, নেতা যেমন গরুও তেমন। এই গরুর মাংস বণ্টনেও থাকে তোষামোদ। ব্যক্তিবিশেষের ক্ষমতা বিবেচনায় কোথাও গরুর রান আবার কোথাও বা আস্ত গরু পাঠান। এ সময় রাজনৈতিক অঙ্গনও বেশ সরগরম থাকে। শোনা যায় এর বাণী, ওর বাণী— বিষয় কোরবানি। তবে কার বাণী যে কোরবানির হাটে জোর বাণী হবে তা বলা মুশকিল। এ সময় কেনাকাটায়ও আছে ভয়, আছে সংশয়, পাছে কী হতে কী হয়। এই ভয়কে মূল্যভীতি বলা হয়। কারণ আয়ের চেয়ে যদি গরুর ক্রয়মূল্য বেশি হয়, তবে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। কারণ সেই আয় হয়তো বৈধ নয়।

শুধু রাজনীতিতেই নয়, আর্টকালচারেও গরু আছে। গরু নিয়ে গান আছে, কবিতাও আছে। ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে...’। আবার ছোটবেলায় পড়েছি ‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে’। অনেকে বলেন, সিনেমার গরু গাছে চড়ে। ইদানীং আবার শোনা যাচ্ছে নাটকের গরুও গাছে চড়ে। তবে গরু গাছে চড়ার কারণে ডাল ভেঙে পড়েছে এমন কথা কোথাও শুনিনি। সুতরাং ওগুলো কথার কথা। অবিশ্বাস্য কিছু হলেই এই উদাহরণটি দিয়ে গরুকে অপমান করা হয়। শুধু গরু কেন, ছাগলকেও ছাড়া হয় না। অনেকেই বলেন, ‘পাগলে কি না বলে আর ছাগলে কি না খায়’, এই কথাটির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ ছাগল সব খেলেও সে অন্তত বিড়ি, সিগারেট, ইয়াবা, গাঁজা, নেশাজাতীয় কিছুই খায় না। ছাগল মাদকাসক্ত নয়, বরং চারিত্রিক দিক থেকেও এরা অনুকরণীয়। একসঙ্গে অনেক গরু-ছাগল থাকলেও এদের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, তদবির, তোষামোদি, চামচামি, কথাকাটাকাটি কিংবা মাথা ফাটাফাটি নেই। এরা সব সময় মিলেমিশে থাকে। এদের অমিল হচ্ছে আকারে, আকৃতিতে, হাঁকে-ডাকে, নামে আর দামে। ছোটবেলায় ‘গরুর রচনা’ লেখেননি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন।

আমার মনে আছে, ছোটবেলায় পরীক্ষার সময় আমাদের সচরাচর তিনটি রচনা লিখতে দেওয়া হতো— ‘আমাদের গ্রাম’, ‘নৌকা ভ্রমণ’ নইলে ‘গরুর রচনা’, আর কিছু পারুক না পারুক ‘গরুর রচনা’ সবাই লিখতে পারত। কারণ গ্রামে সবার বাড়িতেই গরু ছিল। সুতরাং গরুর শিং, লেজ, চামড়া, মাংস, দুধ, গোবর সবকিছু নিয়ে যে কেউ সুন্দর একটি রচনা লিখে ফেলত; যা এখনকার ‘ট্যাব শিশুরা’ লিখতে পারে না। কারণ কোরবানির সময় ছাড়া তারা গরু চোখে দেখে না। বিত্তবান ঘরের সন্তান হলে কোরবানির সময়ও গরু দেখে না। কারণ তখন তারা দেশেই থাকে না। ঈদ করতে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা অন্য কোনো দেশে যায়। কিছুদিন আগে আমার এক পরিচিত ব্যক্তির সন্তানকে ‘গরুর রচনা’ লিখতে বলায় সে লিখল, ‘গরুর মাংস দিয়ে কাবাব হয়। কাবাব আমার খুব পছন্দ। তা ছাড়া বিফ স্টেকটাও খুব মজার। গরুর দুধ দিয়ে মিষ্টি, ছানা, দই হয়। আব্বু সবসময় আমাদের জন্য গরুর দুধের মিষ্টি, দই এসব নিয়ে আসেন।’ অর্থাৎ তার সঙ্গে গরুর সম্পর্ক নেই, আছে গরুর মাংস ও দুধের সম্পর্ক।

কোরবানির গরু কিন্তু সাধারণ গরুর চাইতে একটু অন্যরকম হয়। সাধারণত গরু গৃহে পালিত হলেও সব কোরবানির গরু কিন্তু গৃহে পালিত নয়। এগুলোর কিছু ফার্মে পালিত, কিছু দালাল পালিত, কিছু চোরাকারবারি পালিত, কিছু আবার ব্যাপারী পালিত। তাই পালনভেদে এদের আচার-আচরণ, মেজাজ-মর্জিও ভিন্নরকম। এ সময় অফিস-আদালতেও গরু একটি মূল্যবান প্রাণী। ঈদের সময় অনেকে খুশি হয়ে অনেক কিছু দেন। এই খুশি হয়ে দেওয়াটাকে অন্য ভাষায় ‘ঘুষ’ বলে। একবার এক ঠিকাদারের দেওয়া অর্থ কর্মকর্তা পকেটে ঢোকাতে গেলে অফিস পিয়ন চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘স্যার ওই পকেটে না, ওইটা তো ছাগলের পকেট। আপনি বাম পকেটে রাখেন, ওইখানে সব গরুর টাকা।’ পবিত্র কোরবানির পশু কেনার টাকাটাও ঘুষ হিসেবে দেওয়া ও নেওয়া অন্যায়, অনুচিত এবং অপরাধ। কোরবানির সময় এই গরু নিয়ে মানুষের টেনশনের শেষ নেই। প্রথম টেনশান হলো গরুটা একা দেবেন, না ভাগে দেবেন। যদি ভাগে দেন তাহলে টেনশন— কার সঙ্গে দেবেন। এরপর কেনার ঝামেলা। কোন হাট থেকে কিনবেন, কোথায় সস্তা, ঈদের কদিন আগে কিনবেন। কারণ শেয়ার মার্কেটের মতো ঈদের গরুর দাম উঠানামা করে। আগে কিংবা পরে কিনলে দাম কমবেশি হতে পারে। ধরুন গরুটা কিনলেন, এটা বাড়ি পর্যন্ত আনার একটা ঝামেলা আছে। কীভাবে আনবেন? হেঁটে না গাড়িতে, নাকি নিজের গরু নিজেই নিয়ে রওনা দেবেন? সে ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আছে। কারণ অভ্যাস না থাকার কারণে হঠাৎ রাখালের চরিত্রে আপনি সফল নাও হতে পারেন। ধরুন আনলেন, কিন্তু রাখবেন কোথায়? আর এক টেনশন। শহরে তো আর মাঠ-ঘাট নেই যে সারা দিন রাখলাম, ঘাস খেল, রাতে নিয়ে এলাম। আবার বাড়ির বাইরে রাখলেও টেনশন— কোন সময় চুরি হয়। যেখানেই রাখেন না কেন তাদের খাওয়া-দাওয়ার একটা সমস্যা আছে। সবকিছু সামাল দিয়ে ধরুন গরু কিনে কোরবানিও দিলেন। এবার চামড়ার টেনশন। চামড়া কী করবেন? ইচ্ছা আছে এতিমখানায় দেওয়ার কিন্তু এলাকার সন্ত্রাসীরা এসে প্রেসার দিলে ফ্রি-ও দিতে হতে পারে। ধরুন সব সারলেন, এবার মাংস কাটা। ভাগে দিলে সবাই মিলে কাটা যাবে কিন্তু একা দিলে কাটবে কে? ধরুন কাটলেন। এরপর রান্না। অর্থাৎ কোরবানির গরু নিয়ে অনেকেরই রয়েছে গুরুতর চিন্তা। তবে এসব ক্ষেত্রে চিন্তামুক্তির উপায় হলো, কোরবানির আগেই এসব টেনশনকে কোরবানি দেওয়া। তাহলে দেখবেন আপনি টেনশনমুক্ত হয়ে কোরবানি দিচ্ছেন। গরু নিয়ে একটি চমৎকার জোকস রয়েছে। ক্লাসে শিক্ষক ছাত্রকে প্রশ্ন করলেন, এই বল্টু বলত ৫ থেকে ২ বিয়োগ করলে কত হয়? বল্টু উত্তর দিল, জানি না স্যার।

শিক্ষক তখন রেগে বল্টুকে বললেন, তুই আস্ত একটা গরু।

ছাত্র উত্তর দিল, স্যার আমি তো খুব ছোট, আমাকে গরু বলবেন না, বাছুর বলেন।

গরু নিয়ে খালি জোকস না, অফিস-আদালতেও মানুষ গরুকে নিয়ে অনেক অপমানজনক মন্তব্য করে। কাজে একটু ভুল হলে বলে, ছাগল দিয়া হালচাষ করা যায় না, বলদ লাগে। কেউ বলে, যান কাঁঠাল পাতা খান গিয়ে অর্থাৎ পরোক্ষভাবে তাকে ছাগল বলল। অনেকে তো সরাসরি বলে, গরু পিটাইয়া মানুষ করা যাবে না।

গরু এত উপকারী একটা প্রাণী অথচ গরুকে নিয়ে আমরা কখনো ভালো কথার উদাহরণ দিই না। কিছু না পারলে কাউকে গালি দিয়ে বলি, ‘তুই একটা গরু’। দুজন একই চরিত্রের খারাপ লোক হলে বলি, ‘এক গোয়ালের গরু’। এ রকম ‘গরু খোঁজা’, ‘গোমূর্খ’, ‘গোবরগণেশ’, ‘লেজেগোবরে’, ‘মাথায় গোবর ভরা’, এমনি অনেক খারাপ প্রবাদ-প্রবচন আছে।

শুধু প্রবাদ-প্রবচনেই নয়, যে গরু আমাদের এত উপকার করে তাকে আমরা বেত দিয়ে পিটাই। কাঁধে জোয়াল বেঁধে চাষ করি, গরু দিয়ে গাড়ি চালাই, মাল বহন করি, ঘানি টানি। সেজন্য নাম দিয়েছি ‘কলুর বলদ’। শুধু তাই নয়, গরুর মুখে ঠুলি লাগিয়ে তার খাওয়ার অধিকার কেড়ে নিই, তার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করি। আমার এক বন্ধু একবার বলছিলেন, ‘গরু নয় আমাদের জন্যও এ রকম ঠুলির ব্যবস্থা করা দরকার। তাহলে আমাদের অনেক অযথা কথা কিছুটা হলেও কমত। দেশ ও জাতি কিছুটা হলেও ভেজালযুক্ত কথা থেকে মুক্তি পেত।’

সবশেষে গরুর হাটের প্রতিযোগিতা। কারণ গরুর হাটে গিয়ে দামি গরু কিনে কেউ নামি হতে চান। তাই অনেক বিক্রেতাই ক্রেতা বুঝে দাম হাঁকেন।

অর্থাৎ ‘গরুর খ্যাতিতে কেউ হন খ্যাতিমান

দামি গরু কিনে তারা নামি হতে চান।

গরুর মহিমা নিয়ে গর্বিত মুখে

মহাগরুসনে ছবি তোলে মহাসুখে।’

সেই ছবি ছাপা হয় পত্রিকায়, দেখানো হয় টিভি পর্দায়। আর দামি গরু কিনে তারা হয়ে যান গরু তারকা। তবে একটি প্রশ্ন জাগে মনে, বৈধ আয়ে মহাগরু কেনে কত জনে?

প্রিয় পাঠক! ঈদ মানে খুশি কিন্তু ঈদুল আজহার খুশি— উৎসর্গ করতে পারার খুশি। শুধু নিজের জন্য নয়, সবার জন্য এই খুশি বিলিয়ে দেওয়াই কোরবানি। কোরবানির ঈদ আপনাদের সবার জন্য আনন্দময় হয়ে উঠুক। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

            লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT