Main Menu

মারাক্কেশের বাতাস: লেখকের আত্মদর্শন (পর্ব-২)

হোসেনউদ্দীন হোসেন: 

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বাস্তবের সঙ্গেই রয়েছে মানুষের সম্পর্ক এবং বাস্তব থেকেই ‘বোধ’ এর উদয়। এই বাস্তবই মানুষের অন্তরজগতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বাস্তবের সঙ্গে জীবনটা নিবিড়ভাবে বাঁধা বলে যা কিছু প্রত্যহ ঘটছে, সেই ঘটনাটাই মানুষের মনে চেতনা সৃষ্টি করছে। এটাকেই আমরা বলি বাস্তব জ্ঞান। লেখক ঢাকা শহরে লেখাপড়া অর্জন করতে এসে নানাবিধ বাস্তব অবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। কয়েকটা ঘটনার স্মৃতি আজও তার মনে ভেসে ওঠে-

‘রাত ১২ টা ১ মিনিট। আশির দশকের একটা রাত। কারফিউ শুরু হয়ে গেছে। ভোর ৫ টা পর্যন্ত চলবে। প্রধান সড়কে উঠলেই সেনা সদস্যদের হাতে পড়া। ব্যাপারটা ঝুঁকিপূর্ন। আমি নিচুতলার একটা ফ্লাটের সামনে দাঁড়িয়ে। সিড়ির গোঁড়ায়। একটা কুকুর নির্ভয়ে এগিয়ে আসে। আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। দু’ পায়ের কাছে ভালো করে শুকে নেয় ।  কুঁইকুঁই শব্দ করে। আমার পা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। এক সময় বুঝতে পারি, কুকুরটা ঘুমিয়ে গেছে। নিশ্চিন্ত ঘুম। আমি তার পাহারাদার। চারদিকে কারফিউ। কুকুরটা বোধহয় ভয় পেয়েছ। সামরিক শাসন চলছে’। (ফিরে দেখা ঢাকা)।

বাংলাদেশের সামরিক শাসনামলের একটা চিত্র। লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন ছাত্র। টিউশনি করে টাকা রোজগার করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ছাত্রাবাসে থাকা নিষিদ্ধ। এমনি একটা দু:সময়। লেখকের রাত্রিযাপনের জন্য কোন ঠাঁই ছিলনা। এমনি একটা অবস্থা যে পাবলিক লাইব্রেরীর টয়লেটের একদিকে তার টুথব্রাশ থাকত। যেখানে যেভাবে হোক রাত যাপন করলেও সকাল বেলা তাকে এখানে এসে হাজির হতে হতো হাতমুখ ধুতে। সামনের পাপ্পু হোটেলে করতেন নাস্তা। তারপর লাইব্রেরীতে বসে বই পড়তেন। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন-

‘আমি গোগ্রাসে পড়ি। পড়ি বিবর্তনের ধারায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, তুলনামূলক ধর্মতত্ব, রুশ সাহিত্য ইত্যাদি। আমি পড়ার গভীরে ডুবে যাই । সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়ি। উদ্দেশ্য টিউশনি। রাতে ঢাকা কলেজের বিপরীতে চিটাগাং হোটেল। রাতের খাওয়া। এরপর আশ্রয়ের সন্ধান’ (ফিরে দেখা ঢাকা)।

কি কঠিন জীবনযাপন। সেই সময়ের দিনগুলোতে রাজধানীর ভাসমান মানুষ, খেটেখাওয়া মানুষ, সীমিত আয়ে চলা সাধারণ মানুষের সাথে গভীরভাবে মেশার একটা সুযোগ পান তিনি । সীমিত আয়ের কায়ক্লেশে জীবনযাপন করা ঢাকার এই অতিসাধারণ বেশিরভাগ মানুষের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা,  ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তার আরো মনে হয়েছে, তার মত শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের অনেক ধরণের সংকীর্ণতা থেকে তারা মুক্ত।

ঢাকা শহরে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে বহু অভিজ্ঞতায় সিক্ত হয়েছেন লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসা একজন ছাত্রের বিপদের কথা শুনে তার সাহায্যের জন্য তিনি এগিয়ে আসেন। ভোরবেলা কমলাপুর স্টেশনে নেমে সেই ছাত্রটি একটি রিকশায় করে তার গন্তব্যস্থলের দিকে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারিদের কবলে পড়ে। তাদের হাতে ছিল লাঠি ও ছুরি । তার কাছে যা কিছু ছিল সবই তারা লুট করে নেয়। ব্যাগের মধ্যে ছিল তার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মূল সনদপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র । যদি এগুলো ৭ দিনের মধ্যে সে ফেরত না পায়, তাহলে সে ভর্তি হতে পারবে না। ছাত্রটি বিষন্ন  বদনে কাঁদতে থাকে । লেখক তাকে সান্ত্বনা দেন, বলেন যেকোনো উপায়ে হোক একটা ব্যবস্থা  হয়ে যাবে। অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেন সেই অভিজ্ঞতাটি নিয়ে লিখেছেন একটি অসাধারণ নিবন্ধ- ‘অপরাধ জগতের সেই লোক’। একজন দুর্ধর্ষ লোক যিনি অন্ধকার জগতের ছিলেন প্রধান। লোকটা খুবই ভয়ঙ্কর। তার শরণাপন্ন হন লেখক। সেই ভয়ঙ্কর লোকটিই শেষ পর্যন্ত ছাত্রটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উদ্ধার করে দিয়েছিলেন। লেখক তার মহত্ব সম্পর্কে লিখেছেন যে, এই অন্ধকার জগতের লোকটি যদি সাহায্য না করতেন, তা’হলে এই অসম্ভব কাজটির সমাধান করা  সম্ভব  ছিল না। লোকটি নিজের সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফজলুল হক হলে থাকতেন। অনার্সেও ভালো রেজাল্ট করেন। সে সময় একটা মিথ্যা হত্যা মামলায় তাকে ফাঁসানো হয় । তিনি ফেরার হন। তারপর আর সভ্যজগতে ফিরতে পারেননি। একটার পর একটা অপরাধ করেই তিনি টিকে আছেন। ‘যারা আমাকে অপরাধী হতে বাধ্য করেছে , তারা কিন্তু সবাই ভদ্রলোক’ ( অপরাধ জগতের সেই লোক)।

লেখক খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে এই নিবন্ধের শেষে সভ্যজগতের মানুষের উদ্দেশ্যেই স্মরন করে দিয়েছেন আল কোরানের একটি ধর্মবাণী :

‘একটি মসজিদ নির্মাণে সাহায্যকারী ব্যক্তির আমলনামায়, সেই মসজিদে ইবাদত করার কারণে যতপুণ্য  অর্জিত হয়, তার একটি নিদিষ্ট অংশ যোগ হতে থাকে এবং তার মৃত্যুর পরও তা বলবত থাকে । অনুরুপভাবে কেউ যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাউকে অপারাধী হতে সাহায্য বা বাধ্য করে, তা হলে সেই অপরাধী ব্যক্তি নিজে বা তার বংশধর যত অপরাধ করে, তার পাপ অপরাধী হতে সাহায্য বা বাধ্যকারী ব্যক্তির আমলনামায় যোগ হতে থাকে এবং তা তার মৃত্যুর পরও বলবত থাকে’।

জীবন পথে চলতে চলতে লেখক বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। সেই সঞ্চিত অভিজ্ঞতার লেখ্যরূপ দিয়েছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে । তিনি যে অভিজ্ঞতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেই আলোচনায় ফুটে উঠেছে বৈষম্য, অসঙ্গতি, অমানবিকতা এবং একশ্রেণীর মানুষের লোভ ও ভোগের চিত্র । তাঁর রচনা প্রতিবেদনমূলক নয়। তাঁর রচনার মধ্যে রয়েছে দর্শন চিন্তা এবং সাহিত্য মূল্য । তাঁর রচনায় রয়েছে একটা দৃষ্টিভঙ্গির  বৈশিষ্ট। সমাজের অভ্যন্তরে যে ব্যাধির ক্রমবিস্তার দেখেছেন, সেই ব্যাধি তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চাক্ষুষ করেছেন । যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই দেখেছেন এই ব্যাধি। হাওড় অঞ্চলে গিয়েছেন , দেখেছেন দারিদ্র মোচনের নামে ভয়ঙ্কর এক শোষণ। মরনের কবল তেকে বেঁচে এসেছেন তিনি। তাঁর ‘বটগাছ’ নামক নিবন্ধে স্পষ্ট করেই বলেছেন-

‘দারিদ্রপীড়িত এই ষোল কোটি মানুষের দেশে আমার মত অনেকেই দেশের এই সাধারণ মানুষগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্যে, কপালগুণে, এক একজন এক একটা বটগাছ হয়ে গেছি। কেউ সোজা পথে, কেউ বাঁকা পথে, কেউ রাজনীতি , কেউ ব্যবসা , কেউ চাকুরী, কেউ প্রবাসী হয়ে , কেউ কোন না কোন ভাবে বটগাছ হয়ে গেছি। আমাদেরও অনেক ডালপালা আছে। আমাদের আশেপাশে ভাগ্যবিড়ম্বিত যারা আছে, তারা অনেক আশায় বুক বেঁধে আমাদের ডালপালায় লাল সুতা বা লাল কাপড় বাঁধতে চায়। এ ক্ষেত্রে আমরা কি মাজারের বটগাছের মতো একটু উদার হতে পারিনে’ ? (বটগাছ)। কাকস্য পরিবেদনা। কে শোনে কার কথা !  ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তিই হচ্ছে সর্বস্ব। তার আশেপাশে যারা দুর্ভোগের মধ্যে আছে, তাদের দিকে তাকানোর ফুরসত কোথায়? কে শোষিত হচ্ছে, কে নির্যাতিত হচ্ছে-  এটা হচ্ছে তো তাদের দ্বারায়। যারা শোষক, তারাই তো শোষণ করে থাকে।

আর একটি দুরবস্থার কথা আলোচনা করেছেন লেখক। তথাকথিত ধনীওয়ালাদের বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে। তারা তাদের বাচ্চাকাচ্চাদের পালন করে থাকেন মুরগির খামারিদের মত। না আছে তাদের নিজস্ব স্বাধীনতা, না আছে ঘরের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা। খামারের মুরগির মত বাচ্চারা লালিত পালিত হচ্ছে। বিপদ এলে ঠেকানোর মুরোদ নেই। লেখক সমাজের এইসব কর্তাদের প্রবণতার প্রতি কটাক্ষ করে লিখেছেন-

‘আমার মত অনেকেই আমাদের ছেলেমেয়েদের একইভাবে ফার্মের মুরগির মতো আমরা বড় করছি। ঘরের খাঁচায় শাসনের নজরদারীতে বন্দী তারা। বাইরে খেলাধুলা বা চিত্তবিনোদনের কোন সুযোগ নেই। নেই বন্ধুবান্ধবের সাথে পারস্পরিক স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়ার (interaction) সুযোগ। আছে ভার্চুয়াল যোগাযোগ। তাদের হাতে অত্যাধুনিক সেলফোন, প্লে স্টেশন অথবা কম্পিউটার। আর আছে উর্বর মস্তিষ্ক। উর্বর মস্তিষ্ক আর মেশিনের সংমিশ্রনে নিজেদের তৈরি ফ্যান্টাসি জগতে বাস করে তারা’। (ফার্মের মুরগি )।

আমাদের দেশে চিকিৎসা সেবা নেই। হাজার হাজার ডাক্তার আছেন, সেবা করেননা, ব্যবসা করেন। রোগে ভুগে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ভুল চিকিৎসা করছেন ডাক্তাররা। অর্থ কামাই ছাড়া তারা আর কিছু বোঝেন না। অর্থই তাদের কাছে মূলার্থ। খাবলা খাবলা ঔষধ দিচ্ছেন, কতটুকু কি পরিমাণ রোগীর জন্য প্রযোজ্য, তা জানেন না। ‘এ’ থেকে ‘জেড’ পর্যন্ত ঔষধ। রোগীর হাতে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ঔষধ সেবনে রোগীর শরীরে দেখা দিচ্ছে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। অবশেষে এক রোগ থেকে আর এক রোগের জন্ম হচ্ছে। এর নাম নাকি স্বাস্থ্য সেবা ? লেখক ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সময়ে শারীরিক অসুস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকদের অপচিকিৎসা এবং ভুল চিকিৎসার চিত্র। একজন চিকিৎসক যদি রোগীর শরীরের রোগ সম্পর্কে গবেষণা না করে ভুল ঔষধ প্রয়োগ করেন, তা হলে সেই রোগীর পরিণাম কোন পর্যায়ে যেতে পারে, বিষয়টি নিয়ে কি তারা কখনো ভাবেন? অতি সাধারন একটা রোগীর ভুল চিকিৎসার কারনে পঙ্গু অথবা মৃত্যুও হতে পারে। চিকিৎসা হচ্ছে সেবাধর্মী। এটাকে ব্যবসা বলে মনে করেন যারা, তাঁরা চিকিৎসক নন- অর্থ পিশাচ । আমাদের দেশে সাইনবোর্ড লাগিয়ে বড় বড় ডিগ্রীধারীরা চিকিৎসা সেবার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। রোগীর প্রতি তাদের মনোযোগ নেই। মনোযোগ হচ্ছে অর্থের প্রতি। এই ধরনের প্রবণতা দিনদিন বাড়ছে। খুব কম চিকিৎসক আছেন, এরকম মনোভাব থেকে তারা মুক্ত। বেনাপোল সীমান্তে গেলে দেখা যায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সুচিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গমন করছে। দেশের টাকা বিদেশে গিয়ে খরচ করছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হচ্ছে ভারত। এই চিকিৎসা বিষয়টি নিয়ে আমাদের দেশে যে নৈরাজ্যিক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে, এই ঘটনা নিরসনের জন্য সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রলালয়ের কোনো পদক্ষেপ নেই।

জনগণ চায় সুচিকিৎসা। দরিদ্র মানুষেরা চায় বেঁচে থাকার অধিকার। চায় স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র। চিকিৎসকরা হবেন সেবাপরায়ন। এই বিবেকবোধ চিকিৎসকদের মনে যতদিন জাগ্রত না হবে, ততদিন থাকবে চিকিৎসার নামে নৈরাজ্য। লেখক নিজের কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন যে তার চোখের সমস্যা হয়েছিল। তিনি চক্ষু চিকিৎসকের নিকটে যান। পর পর কয়েকজনকে দেখান। শেষ ডাক্তার তাকে বলেন, চোখে  গ্লুকোমা হয়েছে। গ্লুকোমা  হচ্ছে চোখ অন্ধ হবার প্রাথমিক সূচনা। শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়েছিলেন। একজন মহিলা ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি ব্যবস্থাপত্র দেন। তিনি যা বলেন তার সারমর্ম এই যে, এটা তেমন ঔষুধ দেয়ার মত রোগ নয়। হালকা গরম পানিতে নরম ন্যাকড়া ভিজিয়ে চোখের পাতার মধ্যে কয়েকদিন আস্তে আস্তে ছ্যাঁক দিলে, এটা সেরে যাবে। তাৎক্ষনিক উপশমের জন্যে তিনি ১০ টাকা দামের একটা মলম লিখে দেন। এ পর্যন্ত তার দু’চোখে আর কখনও খচখচ করেনি। (চলবে)

লেখকঃ  ইতিহাসবিদ, উপন্যাসিক, কবি ও সাংবাদিক 

 


ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT