Main Menu

সহী

রাশেদুল ইসলাম  

(আমি কখনও গল্প লিখতে চাইনি । কিন্তু, বিশেষ অনুরোধে একটা  লিখতে হচ্ছে । প্রথম পুরুষে লেখা আমার বদ অভ্যাস। গল্পের প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থান- কাল -পাত্রের উল্লেখ করা হয়েছে ।  সবই কাল্পনিক।)

(এক)

আমি টেলিফোনটা ধরি । ওপাশে নারীকণ্ঠ ।

-‘আমার নাম সহী । আমরা একই সাবজেক্টে পড়তাম । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে । আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন’ ?

আমার গা  ঘামতে থাকে  । শরীরে কেমন যেন কাঁপুনি হয় । আমি শক্ত করে টেলিফোনের রিসিভার  আঁকড়ে ধরি । নিজেকে সামলে নেয়ায় চেষ্টা করি । ধীরে ধীরে বলি,

-’দেখ সহী,  তোমাকে না চেনা মানে,  আমার নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা । তুমি সেই মেয়ে,  যার পিছনে আমি পাকা আটবছর ঘুরেছি । আমি জীবনে যতবার তোমার নাম নিয়েছি;  ততবার আল্লাহ্‌র নাম জপ করলে, আমি নির্ঘাত একজন আউলিয়া বা দরবেশ হয়ে যেতাম’ ।

- ‘আমি আসলে তোমার কাছে ফোন করেছি মাফ চাওয়ার জন্য । তুমি আমাকে মাফ করে দিও’।  ওপাশ থেকে সহী ।

-এতো বছর পর এই মাফ চাওয়ার কি কোন দরকার ছিল ? তবে, মাফ চাওয়ার কথা বলে ভালো করেছো তুমি  । এই মধ্যবয়সে আমার নিজেরই মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার কাছে মাফ চাওয়ার কথা । তার সুনির্দিষ্ট কারণও আছে । একটা মেয়ে  আমাকে মোটেই পছন্দ করে না; অথচ, আমি তার পিছনে ঘুরি । বিরক্ত করি। এসব ভাবলে এই বয়সে সত্যিই আমি লজ্জা পাই । এজন্য ক্ষমা  চাওয়া উচিত আমার । তবে, তোমার মাফ চাওয়ার কোন কারণ আমি দেখিনে । সে সময় তুমি আমাকে মোটেও বিরক্ত করোনি । বিরক্ত করেছি আমি । এজন্য  পারলে তুমিই আমাকে ক্ষমা করে দিও ।

-  ‘আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছি । আমার ভয় ছিল, তুমি আমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করবে’ ।

-  ‘তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করার কোন কারণ নেই । একটা মেয়ে একটা ছেলেকে পছন্দ করবে,  কি করবে না- এটা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব ব্যাপার । আমি তোমাকে পছন্দ করতাম; ভালবাসতাম-  এটা শতভাগ সত্য । কিন্তু, এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার । তুমি আমাকে পছন্দ করতে বাধ্য ছিলে না । আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি । তাই,  তুমি পছন্দ করনি । এটা তোমার দিক থেকে কোন অপরাধ নয় । আর, কারো জীবন কেউ নষ্ট করতে পারে না । আমি নিজে অনেকটা অদৃষ্টবাদী মানুষ । এ কারণে,  তুমি যে আমার জীবন নষ্ট করেছ; এটা আমার মনে হয়না । এ ধরণের অপরাধবোধ তোমার মধ্যে থাকা উচিত নয়’ –আমি বলি ।

-আমি তোমার কাছে দুটো জিনিস চাই ।

-বলো ।  

- এক নম্বর, আমি তোমার পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চাই । দুই, কয়েকটা বিষয়ে আমি তোমার ব্যক্তিগত সাহায্য চাই ।

কেমন যেন  থতমত খাই আমি । টেবিলের উপর  টেলিফোনের রিসিভার রেখে উঠে দাঁড়াই । কক্ষের দরজা বন্ধ করি । ফিরে এসে রিসিভার আবার কানের কাছে ধরি ।

-আমার পরিবারের সাথে তোমার ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব নয় ।  কারণ, তুমি এখনও অবিবাহিতা । আমার পারিবারিক দুঃসংবাদের কথা তুমি হয়ত  শুনেছ । আমার স্ত্রীর শরীরে বেশ কয়েকবার অপারেশন করাতে হয়েছে । প্রায়ই সে  অসুস্থ থাকে । আমার স্ত্রীর মধ্যে কোন ধরণের সংকীর্ণতা নেই এটা সত্য; তারপরও হটাৎ আমার পরিবারে তোমার যাতায়াত শুরু হলে,  তার মনের উপর চাপ পড়তে পারে । আমি নিজে এই ঝুঁকি নিতে চাইনে । তাছাড়া, তুমি যে ধরণের সম্পর্কের কথা বলছ, এর প্রয়োজনটাই  বা কি ? তবে, তোমার ব্যক্তিগত কোন ব্যাপারে আমার সাহায্যের প্রয়োজন হলে, তা তুমি পেতে পার ।

-আমি সত্যিই  তোমার কিছু সাহায্য চাই । সহী বলে চলে -  আমি একটা বেসরকারি সংস্থায় কাজ করি । সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করি । কিন্তু,বেশীর ভাগ কাজের সাথে লিগ্যাল বিষয় জড়িত। এসব কাজে সরকারের সাহায্য প্রয়োজন । আমি এখন পর্ণগ্রাফি প্রতিরোধ  নিয়ে কাজ করছি । তুমি কি জান, যারা শিশুদের দিয়ে পর্ণছবি তৈরির মত জঘন্য অপরাধ করে, প্রচলিত আইনে তাদের শাস্তির কোন বিধান নেই ? আইন ছাড়া কোন বিধান হয় না । আর, আইন তৈরি করে সরকার । আমরা যখন এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে কথা বলি - তেমন সহযোগিতা আমরা পাইনে  । এ জন্যই তোমার সাহায্য দরকার ।

- দেখ সরকার জনবিচ্ছিন্ন কোন সংগঠন নয় । আমি বলি ।  ‘ তোমরা যেমন সাধারণ মানুষের জন্য কাজ কর; সরকারও তেমন সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে । তোমার আমার মধ্যে যদি একটি বিষয় কমন থাকে; তাহলে সরকার এবং বেসরকারী সংস্থার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই । এই কমন বিষয় হোল, ‘দেশপ্রেম’ । তুমি দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করছ । আমি নিজেও দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করছি । কিন্তু, অসুবিধা হোল, তুমি আমাকে বোঝাতে পারছ না ।   আমিও তোমাকে বোঝাতে পারছিনে । এ এজন্যই সমস্যা । পরস্পরের মধ্যে একটা কমুনিকেশন গ্যাপ থেকে যাচ্ছে । এ কারণে, সরকারি ও বেসরকারী সংস্থার মধ্যে বিভিন্ন ফোরামে মতবিনিময় হওয়া দরকার । তাহলে এই দূরত্ব কমে আসবে । দেশের স্বার্থেই এই দূরত্ব কমানো দরকার । তুমি যে পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের কথা বলছ, সরকারও এটা চায় । তুমি জান নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে সাথে সমাজে নতুন নতুন অপরাধ চলে আসে । প্রচলিত আইনে এসব নতুন  অপরাধের বিচার করা যায় না । আবার নতুন আইন তৈরি করা খুব সহজ কাজ নয় । অপরাধের ধরণ ও ব্যাপকতা বুঝতে হয় । অনেক গবেষণা দরকার । জনমত সৃষ্টিরও প্রয়োজন হয় । তোমাদের বেসরকারী সংস্থার ক্ষেত্রে এগুলোর ঢালাও সুযোগ আছে । তোমরা নিশ্চয় পর্ণগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরির ব্যাপারে গ্রাউনড ওয়ার্ক করেছ ?

হ্যাঁ । এ বিষয়ে আমাদের গবেষণা আছে । আমরা একটা ধারণাপত্র  তৈরি করেছি । এর উপর প্রেসক্লাবে একটা কর্মশালা হবে । আমরা  চাই এই কর্মশালায় মন্ত্রণালয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি উপস্থিত থাকুন ।  তুমি নিজে যদি থাক, তাহলে আমি খুব খুশী হব ।

- সহী,  তুমি নিজে আমাকে একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিচ্ছ, এটা আমার জন্য একটা মিষ্টি  স্বপ্নের মত আনন্দের । কিন্তু, অনেক দেরী হয়ে গেছে । মানুষের জীবনে বিশ বছর আসলেই একটা লম্বা সময় । তবে, তুমি নিশ্চিন্ত থাক ।   তোমাদের কর্মশালায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকবে । আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিও থাকবে । এটা তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কারণে নয় । এটা একটা জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় । সরকার নিজেই চায়,  পর্ণছবি প্রতিরোধ আইন তৈরি হোক । তোমরা এখানে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করছ । এজন্য তোমাদের ধন্যবাদ ।

-কিন্তু, তুমি নিজে আসতে চাওনা কেন ?

- সত্য কথা হোল, আমি চাইনে তোমার সাথে আমার কখনও দেখা হোক । এক সময় তোমাকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছি । সে চাওয়ার মধ্যে কোন প্রতারণা ছিল না । আমি গ্রামের ছেলে ।  শহরের ছেলেদের মত স্মার্ট নই । তাই, তুমি আমাকে অবজ্ঞা করেছ । কিন্তু, সেদিন যেহেতু আমি তোমার সব দায়িত্ব নিতে চেয়েছি; আমি আমৃত্যু সে দায়িত্ব পালন করতে রাজি । তুমি বিনা দ্বিধায়  তোমার যে কোন প্রয়োজন আমাকে বলতে পার । তবে, শর্ত একটাই । তোমার সাথে আমার কখনও দেখা হবে না । আসলে তোমার আমার মাঝখানে এখন আছে এক সন্তানহারা মা - আমার অসুস্থ স্ত্রী । সে খুব সরল ও স্বামী অন্তপ্রাণ স্ত্রী ।  দেখ সহী, আমি কখনও সরকারি আমলা হতে চাইনি । তোমাকে খুশী করার জন্যই আমার আমলা হওয়া । আমার ধারণা ছিল, আমলাদের পাত্রের বাজার ভালো । তাই, চাকুরী পাওয়ার পর তোমার সাথেই আমি প্রথম দেখা করি । আর, তুমি তখন চূড়ান্তভাবে আমাকে  জানিয়ে দেও, আমার সাথে তোমার বিয়ে হওয়া সম্ভব নয় । সেদিন সত্যই আমি মনে কষ্ট পাই । বেশ কয়েকমাস উদ্দেশ্যহীনভাবে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় আমি । তারপর অনেক ভেবে একটা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই । আমি সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে এই  বিয়ে করেছি । তাই, আমার স্ত্রীর কোন অসম্মান হোক বা সে কোন বিষয়ে কষ্ট পাক; আমি নিজে কোনভাবেই তা চাইনে।

- আমি নিজেও চাইনে,  আমার কারণে তোমার স্ত্রীর সাথে তোমার  সম্পর্ক খারাপ হোক । আর, এরকম কোন কিছু যদি আমার কানে আসে,  তাহলে হয়ত আমাকেই আত্মহত্যা করতে হবে । আমি তোমার অনেক ক্ষতি করেছি ।  তোমার আর কোন ক্ষতি হোক, আমি চাইনে ।

- ‘আসলে ব্যাপারটা হয়ত তেমন  সিরিয়াস কিছু হবে না’ । আমি আলোচনা হালকা করার চেষ্টা করি । বলি,  ‘যাহোক, আমার মনে হয় আমাদের আজকের আলোচনা এ পর্যন্তই থাক । তোমার কর্মশালার বিষয়টা আমি দেখব । তোমার যেকোন প্রয়োজন আমাকে জানাতে পার’ ।

আমি টেলিফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখি ।

সচিবালয় কেন যেন ফাঁকা চারিদিক । কোন দর্শনার্থী নেই । পিয়নটাও ছুটিতে । জানালা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করি । কিছুই দেখিনে ।  দুচোখ ঝাপসা হয়ে আছে । চশমাটা খুলে রাখি । টেবিল থেকে টিস্যু পেপার নিয়ে দুচোখে চেপে ধরি । (চলবে)

-

 

ADVERTISEMENT

Contact Us: 8 Offtake Street, Leppington, NSW- 2569, Australia. Phone: +61 2 96183432, E-mail: editor@banglakatha.com.au , news.banglakatha@gmail.com

ADVERTISEMENT